Opinion

হুজুগ নয় প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে তুলে ধরা গণমাধ্যমকর্মীর দায়িত্ব

আমিরুল ইসলাম:
মিডিয়া এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা জনগণকে যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে নিয়ে যেতে পারে। তারা কোনদিকে নিয়ে যাবে সেটা তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়। বিশ্ব এখন কোন সংকটে পতিত হয়েছে, দেশের কোন সংকট মুখ্য সেটা আমাদেরকে সঠিকভাবে প্রচার করতে হবে। আজকে দেখা যায় সাধারণ একটি পৌরসভা নির্বাচনকে নিয়ে দিনের পর দিন তুমুল প্রচার, টকশো, সংবাদ, লাইভ টেলিকাস্ট, প্রতি মুহূর্তের আপডেট ইত্যাদি হুলুস্থুল করে ফেলা হচ্ছে, ফলে মানুষের চিন্তা, দৃষ্টি ঐ সামান্য বিষয়ের প্রতি নিবদ্ধ হয়ে যায়।

এখন মিডিয়া কি জাতিকে ক্রিকেট জ্বরে আক্রান্ত করবে নাকি জাতীয় সমস্যার সমাধানে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য প্রণোদিত করবে, জাতিকে রক্ষার জন্য সম্মিলিত ঐক্যের প্রেরণা সৃষ্টি করবে, মানবতার কল্যাণে কাজ করতে দিক নির্দেশনা প্রদান করবে, মানুষের দেশপ্রেমের চেতনাকে কাজে লাগাবে না হুজুগে অপচয় করবে এ সিদ্ধান্ত মিডিয়াকে নিতে হবে।

গত ১ ডিসেম্বর ২০১৫ বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত “আঙ্গুল এখন আমাদের দিকে” শীর্ষক একটি লেখায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও একাত্তর টেলিভিশনের অ্যাফেয়ার্স এডিটর সামিয়া রহমান খুব সরলভাবেই এই সত্যটি স্বীকার করে নিয়ে লিখেছেন, “আমাদের গণমাধ্যমকর্মীদের, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অবশ্য এটি খুব প্রচলিত অভিযোগ আমরা সবকিছু বদলে দিই। আমরা নাটকীয়তা তৈরি করি, ঘটনা তৈরি করি। সেনসেশন, উত্তেজনা তৈরি করি। আমরা সব সময় সবার দিকে আঙ্গুল তুলি। অভিযোগ করি। এখন অভিযোগের তীর স্বয়ং আমাদের দিকে, গণমাধ্যমের দিকে। গোটা বিশ্বের গণমাধ্যমের এজেন্ডা নির্ধারণ এবং এজেন্ডার পক্ষে সম্মতি অর্জনের জন্য প্রচার নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। বলা হচ্ছে গণমাধ্যম পক্ষপাতিত্ব করে, গণমাধ্যম নিরপেক্ষ নয়। নানা অভিযোগে আমরা জর্জরিত। এখন সঙ্গে নতুন অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। বলা হচ্ছে আমরা বিভ্রান্তি তৈরি করছি বা উসকে দিচ্ছি।

সমাজের বিভিন্ন স্তরে গণমাধ্যম তার্ ক্ষমতার বিকাশ ঘটিয়েছে। শুধু তথ্য, বিনোদন ও শিক্ষা দিয়েই নয় বরং এ তিনটি কাজের মাধ্যমে বলীয়ান হয়ে গণমাধ্যম এখন মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। …গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছে যে, ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং তা প্রচার ও প্রসারের জন্য তারা এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, সমাজে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা যত বেড়েছে, গণমাধ্যম তত মানুষের কাছাকাছি পৌঁছতে পেরেছে এবং তার একচ্ছত্র আধিপত্য তত বেড়েছে। কতটুকু সফল হচ্ছে তা আলোচনাসাপেক্ষ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, সত্যি কি আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা এখন মানুষের চিন্তার দিক পরিসর ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়ার নামে ব্রহ্মাণ্ডের মহাপ্রলয় ঘটাতে যাচ্ছি?”

আজকের গণমাধ্যম সম্পর্কে বলতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন এর একটি উক্তিই যথেষ্ট। তিনি ‘যুদ্ধবাজ সাংবাদিকতা বনাম মুক্ত-মিডিয়া মিথ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “মূলধারার গণমাধ্যম মূলত কর্পোরেট গণমাধ্যম, বিশাল সংস্থাগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের এজেন্ডা প্রসারের কাজেই গণমাধ্যম ব্যবহৃত হয়। কর্পোরেট এলিটকুল গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে মস্তিষ্ক ধোলাইয়ের জন্য, মানুষকে তথ্য দান বা সচেতন করে তোলার জন্য নয়।”

যারা মিডিয়াতে কাজ করতে আসছেন তাদের অধিকাংশই আসছেন সাংবাদিকতা পেশার সুবিধা হাসিল করে অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের জন্য। তাদের স্বার্থপরায়ণতা ও পক্ষপাতিত্বসুলভ মনোবৃত্তির দরুন তাদের পরিবেশিত সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতাও হারিয়ে যাচ্ছে। বিবিসি কিংবা রয়টার্সের মতো সংবাদসংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাদের প্রতিবেদকগণ বহুবার তাদের নির্ধারিত সীমানা পেরিয়েছেন, কখনও ভুল তথ্য পরিবেশন করেছেন, কখনও সেটা রাজনীতিক শুদ্ধতাকে লঙ্ঘন করেছে। কিছুদিন আগে বিবিসির মহাপরিচালক ও প্রধান সম্পাদক জর্জ এনটুইসেল এক রাজনীতিকের নামে মিথ্যাচার করার দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন (প্রথম আলো, ১১ নভেম্বর ২০১২)। সাম্প্রতিক একটি জরিপে জানা যায় ব্রিটেনের ৭০% জনগণই পত্র-পত্রিকার সংবাদ বিশ্বাস করেন না (The Guardian- 24.01.2012)।

বিশ্বাস না করার কারণ গণমাধ্যমগুলো বার বার মানুষকে ভুল পথে নিয়ে গেছে, মিসগাইড করেছে যা পরে জনগণ বুঝতে পেরেছে যে সেটা মিথ্যা ছিল। যেমন- ইরাকের বিরুদ্ধে প্রচারিত গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার মিথ্যা অভিযোগের কথা যা চূড়ান্ত বিধ্বংসের পর মিথ্যা বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল। মিডিয়া যখন স্বার্থভিত্তিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে তখনই তার অধঃপতন হয়েছে। এই কথাগুলো বলার কারণ হচ্ছে, পশ্চিমারা যেদিকে মানুষকে নিয়ে যেতে চায় সেদিকে অন্ধের মতো না গিয়ে দেশ ও জাতীকে নিরাপদ রাখতে স্বাধীন দেশের স্বাধীন গণমাধ্যম হিসাবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটানো এখন সময়ের দাবি। লেখক: আমিরুল ইসলাম, সাংবাদিক।

Related posts

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

admin

একজন গণমাধ্যম কর্মীর দায়বদ্ধতা ও মর্যাদা

admin

Leave a Comment